কবিগুরু তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতেন।মৌলালিতে জমি, বাড়ি দান করে দেন।ভারতবর্ষের দন্তচিকিৎসার জনক, তিনি বাংলা ও বাঙালির গর্ব, পেশাগত এবংসামাজিক কর্মপ্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ ভারত সরকার ১৯৬৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি প্রদান করেন তাঁকে।পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্যে হোটেলে বাসন মাজতেন, তিনিই হয়ে উঠলেন ভারতবর্ষের দন্তচিকিৎসার জনক—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতেন | দুজনের মধ্যে চিঠিপত্রের বিনিময়ও হত | এমনই একটি চিঠিতে কবি চিঠির শেষে ছোট্ট নোটে ডাক্তারবাবুকে লিখেছেন, তাঁর জন্য তিনি যে নকল দাঁত বানিয়ে দিয়েছেন, তা নিয়ে তিনি স্বচ্ছন্দেই রয়েছেন। এর জন্য ধন্যবাদও দিয়েছেন ডাক্তারবাবুকে!জন্ম ১৮৯০ সালের ২৪শে ডিসেম্বর | বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানার বর্ধনপাড়া গ্রামে | অসম্ভব মেধাবী ছিলেন ছোট থেকেই | নবাবগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন | এরপর আলীগড় মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ থেকে আই.এসসি পাস করেন। ঠিক করলেন উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেত পাড়ি দেবেন | এই সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ হয় | বোম্বাই থেকে বিলেত যেতে জাহাজ ভাড়াই লাগতো সাড়ে তিনশ টাকা – সেখানে তাঁর সম্বল ছিল মাত্র পঞ্চাশ টাকা |কিন্তু তিনি যে পিছিয়ে আসার লোক নন | বোম্বাই পৌঁছে খোঁজ খবর নিয়ে বিলেত গামী জাহাজের আলুর খোসা ছাড়ানোর কাজ নিলেন। সাত , আটশো লোকের খাবারের আলুর খোসা ছাড়াতে হবে তাকে। বিনিময়ে বিনা পয়সায় বিলেত যেতে পারবেন এবং ১৪ টাকা করে সপ্তাহে মজুরি পাবেন।এই ভাবে দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার পর একদিন লন্ডনে পৌঁছালেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানলেন পড়াশোনার খরচ অনেক বেশি । বরং আমেরিকাতে তুলনামূলক কম খরচে পড়াশোনা করা সম্ভব। এবার তাহলে আমেরিকায় যাওয়া মনস্থ করলেন । ইংল্যান্ডে বেশি বিলম্ব না করে আমেরিকা গামী আর এক জাহাজে চেপে বসলেন।সঞ্চিত অল্প কিছু টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে দেখে জাহাজের বাঙালি খালাসিদের গিয়ে বললেন , তোমরা আমাকে খেতে দেবে, বিনিময়ে আমি তোমাদের চিঠিপত্র বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র লিখে দেবো।খালাসিরা তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। চিঠিপত্র লেখার কাজ ছাড়াও জাহাজে তিনি ঘোড়া প্রতিপালনের সহিস হিসেবেও কাজ করতেন।এরপর তিনি আমেরিকায় আইওয়া ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হন | পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য তিনি একটা হোটেলে বাসন মাজার কাজ নিয়েছিলেন | তাঁর পান্ডিত্যে মুগ্ধ হন কলেজের অধ্যাপকরা | ১৯১৫ সালে স্মাতক হন তিনি | কাজের সুযোগ আসে ফোরসিথ ডেন্টাল ইনফারমারী ফর চিলড্রেন ইন বোস্টন, ম্যাসাচুসেট্স এ | ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ টানা তিন বছর সেখানেই প্রাকটিস করতেন | পেয়েছেন প্রচুর খ্যাতি | হয়েছে নামডাক |কিন্তু ডাক্তারবাবুর মাথায় তখন ঘুরছে স্ব-দেশ বলে এক ভৌগোলিক পরিসরের সাবেকি ধারণা। অধীত বিদ্যা বাংলার ছাত্র ছাত্রীদেরদের শেখাতে হবে, ওই শেখানোর গোষ্পদেই বিশ্বদর্শনও শেখা হবে। বাংলায় ফিরলেন ১৯১৯ সালে | প্র্যাক্টিস শুরু করলেন বাংলাতেই |তাঁর জীবনদর্শন ছিল: “শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; কিন্তু কেউ যদি শিক্ষার খরচ বহন করতে না পারে তবে আমি যথা সম্ভব বহন করব। ” আর ছিল বাংলার প্রতি গভীর ভালোবাসা |১৯২০ সাল | এই কলকাতা শহর থেকেই ভারতে আধুনিক দাঁতের চিকিৎসা শুরু করেছিলেন তিনি। সরকারি সাহায্য ছাড়াই নিউইয়র্ক সোডা ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ভারতে প্রথম কলকাতা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২০ সালে কলেজের একশো বছর পূর্ণ হওয়ার কথা। হাসপাতালের ব্যয়ের একটি বড় অংশ আসত কলকাতায় তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি আধুনিক আইসক্রীম পার্লারের উপার্জিত আয় থেকে। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনিই ছিলেন অধ্যক্ষ। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা ‘হ্যান্ডবুক অব অপারেটিভ ডেন্টিস্ট্রি’ যা আজও দন্তচিকিৎসার বাইবেল |তিনি বেংগল ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন(১৯২৫) প্রতিষ্ঠাতা, যা ইন্ডিয়ান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন (১৯২৮) এর গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ইন্ডিয়ান সভাপতি | ১৯২৫ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ডেন্টাল জার্নাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তার সম্পাদক ছিলেন।১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি কংগ্রেসের সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান থাকেন। স্বাধীন ভারতে বিধান চন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায় পশ্চিমবঙ্গের কৃষি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন। ছিলেন দুবারের পুরসভার নির্বাচিত কাউন্সিলর। ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার সদস্য

|ইন্ডিয়ান ডেন্টাল এসোসিয়েশন ১৯৭৭ সালের বার্ষিক ভারতীয় ডেন্টাল কনফারেন্সে পদক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় ডেন্টিস্ট্রিতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দেয়। পিয়েরে ফ্রঁচার্দ একাডেমী তাদের ১৯৮৭ সালে ত্রৈমাসিক পিএফএ জার্নাল তাঁর স্মৃতিতে উৎসর্গ করে | আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টিস্ট্রি অ্যালামনি এসোসিয়েশন ইউনিভার্সিটি ১৯৮৯ সালে তাদের প্রথম বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসাবে তাঁকে সম্মাননা দেয়।মৌলালি মোড়ে ব্যস্ত রাজপথের ধারে তাঁর নাম সঙ্গে নিয়েই দাঁড়িয়ে রাজ্যের এক নম্বর সরকারি দাঁতের হাসপাতাল তথা মেডিক্যাল কলেজ।কলেজের জন্যে মৌলালির নিজের জমি ও বাড়ি সরকারকে দিয়ে দেন। সেখানেই দাঁতের হাসপাতাল স্থানান্তরিত হয়।তিনি ডাঃ রফিউদ্দিন আহমেদ | ১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ডা. আর আহমদ কলকাতায় পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে ডা. আর আহমদ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল রাখা হয় | তাঁর জন্মদিনকে (২৪ ডিসেম্বর) ‘ন্যাশনাল ডেন্টিস্ট ডে’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে |গোবরায় তিন নম্বর কবরস্থান | ধুলো-ময়লায় ঢাকা আগাছার জঙ্গলে সাদা এক খণ্ড পাথর উঁকি মারছে। তাতে ইংরেজিতে খোদাই করা—‘ডাক্তার রফিউদ্দিন আহমেদ (১৮৯০-১৯৬৫)। এখানেই মাটির তলায় শুয়ে রয়েছেন ভারতের দন্ত চিকিৎসার ইতিহাসের জনক। #সংগৃহীত




